Agri Education 24 (agrieducation24.blogspot.com)
--:--:--

Top News

অনুজীব সার উৎপাদন কৌশল ও ব্যবহার পদ্ধতি।

কৃষিতে অনুজীব সারের গুরুত্ব অপরিসীম। রাইজোবিয়াম অনুজীব সার এক ধরনের উপকারী ব্যাকটেরিয়া রাইজোবিয়াম থেকে তৈরি করা হয়। রাইজোবিয়াম সার প্রয়োগের বেশ কিছু পদ্ধতি রয়েছে।

অণুজীব সারের ধারণা (Concept of Bio-fertilizer)

মাটিতে উদ্ভিদের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান সরবরাহের উদ্দেশ্যে যখন কিছুসংখ্যক অণুজীবকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কোনো পুষ্টি বা আবাদ মাধ্যমে জন্মিয়ে উপযুক্ত বাহকের সাহায্যে জীবন্ত অবস্থায় জমিতে প্রয়োগ করা হয়, তাই অণুজীব সার। এ সারের সাহায্যে উপযুক্ত প্রজাতির অণুজীব মাটিতে সরবরাহ করা হয়। মাটির অনুকূল পরিবেশে এসব অণুজীব ব্যাপকভাবে বংশবিস্তার করে। এ সকল অণুজীবের উপস্থিতিতে মাটিতে জৈবপদার্থের পচনক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং পুষ্টি উপাদান নিঃসৃত হয়। ফলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।
অণুজীব সারের প্রকারভেদ (Classification of Bio-fertilizer)

অণুজীব সার প্রধানত ৩ প্রকার। যথা :

(ক) নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী অণুজীব সার : যেসব অণুজীব সরাসরি বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন নিজ দেহে সংবন্ধন করতে পারে তাদের বলে নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী অণুজীব। ইহা আবার দু’প্রকার। যথা— (১) মিথোজীবী যেমন— রাইজোবিয়াম, নীলসবুজ শ্যাওলা ও (২) মুক্তজীবী: যেমন— অ্যাজোটোব্যাক্টর।
(খ) ফসফেট দ্রবীভূতকারী অণুজীব সার : যেসব অণুজীব মাটিস্থ অদ্রবীভূত ফসফেটকে দ্রবীভূত করে গাছের জন্য সহজলভ্য করে তুলতে পারে তাকে ফসফেট দ্রবীভূতকারী অণুজীব বলে। যেমন : পেনিসিলিয়াম।
(গ) কম্পোস্ট উৎপাদনকারী অণুজীব সার : যেসব অণুজীব কম্পোস্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হয় তাদের বলে কম্পোস্ট উৎপাদনকারী অণুজীব। যেমন— ট্রাইকোডার্মা।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী নিম্নলিখিত অণুজীব সারগুলো জমিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন— ১. রাইজোবিয়াম অণুজীব সার, ২. এ্যাজোলা অণুজীব সার, ৩. অ্যাজোটোব্যাক্টর অণুজীব সার, ৪. মাইকোরাইজাল অণুজীব সার ৫. শ্যাওলা অণুজীব সার এবং ৬. ট্রাইকোডার্মা অণুজীব সার।
অণুজীব সারের গুরুত্ব (Importance of Bio-fertilizer)
১. ডালজাতীয় ফসল উৎপাদনে অণুজীব সার ব্যবহার করলে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয় না।
২. পৃথিবীর মোট বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেনের অর্ধেকেরও বেশি অণুৈজবিক প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত হচ্ছে।
৩. বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে ক্রমবর্ধমান সারের চাহিদা মেটাতে অণুজীব সার বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
৪. পরিবেশ সুরক্ষায় অণুৈজবিক সার বিশেষ সহায়ক। এ সারের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
৫. এ সারের উৎপাদনব্যয় খুব কম এবং মানুষ ও পশুপাখির জন্য ক্ষতিকর নয়।
৬. স্থানীয়ভাবে এ সার তৈরি করা যায়।
৭. অনুর্বর ও বেলেমাটিতে এ সার প্রয়োগের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বাড়ানো যায়।
৮. অণুজীব সার ডালজাতীয় ফসলে ২০–৪৫% পর্যন্ত ফলন বাড়ায়।
৯. ধানের জমিতে অ্যাজোলা অণুজীব সার ব্যবহার করলে ইউরিয়া সাশ্রয় হবে শতকরা প্রায় পঁচিশ ভাগ।
১০. ৫০ কেজি ইউরিয়া সারের কাজ করে মাত্র ১ কেজি অণুজীব সার, যার উৎপাদন খরচ হয় মাত্র ৭৫ টাকা।

রাইজোবিয়াম অণুজীব সার উৎপাদন কৌশল

Production Technique of Rhizobium Bio-fertilizer

ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয় নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী রাইজোবিয়াম অণুজীব সার। রাইজোবিয়াম হলো এক প্রকার উপকারী ব্যাকটেরিয়া যা শিমজাতীয় উদ্ভিদের শিকড়ে গুটি বা নডিউল সৃষ্টি করে। এ জাতীয় ব্যাকটেরিয়া বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংযোজন করে নিজের প্রয়োজন মিটায় এবং অবস্থানকারী উদ্ভিদকে সরবরাহ করে। শিমজাতীয় উদ্ভিদ যেমন— চীনা বাদাম, সয়াবিন, মসুর, ছোলা, মটর ইত্যাদি ফসলে রাইজোবিয়াম জাতীয় ব্যাকটেরিয়া সার ব্যবহার করে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়। রাইজোবিয়াম অণুজীব সার তৈরির পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো :
রাইজোবিয়াম অনুজীব সার


১। অণুজীব সংগ্রহ : শিমজাতীয় উদ্ভিদের শিকড়ের নডিউল থেকে রাইজোবিয়াম সরাসরি আলাদা করে গবেষণাগারে সংরক্ষণ করা হয়। সংগৃহীত রাইজোবিয়াম প্রজাতি কতগুলো পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতকরণ করা হয়। এ কাজের জন্য প্রথমত বিভিন্ন মৃত্তিকা অবস্থায় সুপারিশকৃত উদ্ভিদকে কার্যকরী নডিউল তৈরি করতে সক্ষম হতে হবে এবং উদ্ভিদটির অনুপস্থিতিতে প্রজাতিটির মাটিতে টিকে থাকার ও বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা থাকতে হবে। তাছাড়া কালচার মিডিয়াতে জন্মানোর ক্ষমতা, পিটে জন্মানো এবং টিকে থাকার ক্ষমতা এবং নডিউল উৎপাদনক্ষমতা উক্ত রাইজোবিয়াম প্রজাতির থাকতে হবে।
২। আবাদ মাধ্যমে অণুজীব জন্মানো (ব্রথ প্রস্তুতকরণ) : ব্রথ প্রস্তুতকরণ বলতে ব্যাকটেরিয়ার তরল কালচার প্রস্তুতকরণ বোঝায়। এ ব্রথই বাহকে প্রবেশ করিয়ে সার প্রস্তুত করা হয়। নির্বাচিত প্রজাতি টেস্টটিউবের ভেতর জন্মানো হয় এবং বড়ো ফ্লাস্কে তরল মিডিয়ায় স্থানান্তরিত করে ৪ থেকে ৯ দিনের জন্য জন্মানো হয়। এরপর ব্রথের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য ফ্লাস্ক থেকে ফার্মেন্টারে স্থানান্তরিত করা হয়। ফার্মেন্টারের ভেতরে মিডিয়ামকে ১৫ পাউন্ড চাপে ও ১২০° সে. তাপমাত্রায় জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা থাকে।
তরল পুষ্টি মাধ্যমের বিভিন্ন উপাদান ও পরিমাণ 

এর পর তরল মাধ্যমটি ১৫ পাউন্ড চাপে (
 সে. তাপমাত্রায়) নির্বীজ করা হয় এবং ঠান্ডা তরল মাধ্যমে নির্বাচিত অণুজীব (রাইজোবিয়াম) জন্মানো হয়। তরল কালচারকে 
 সে. তাপমাত্রায় রেখে অনবরত কিছুক্ষণ ঝাঁকুনি দিলে ভিতরের তরল মাধ্যমে অক্সিজেন প্রবেশ করে প্রচুর অণুজীব উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়। এরপর এ অণুজীব তরল অবস্থায় বাহকের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

৪। পীট মাটি তৈরি : রাইজোবিয়ামের বাহক হিসেবে পীট মাটি ব্যবহৃত হয়। প্রথমে পীট মাটি সংগ্রহ করে রোদে শুকাতে হয়। তারপর গুঁড়া করে নিয়ে চালতে হবে। এরপর এতে শতকরা ২-৩ ভাগ ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা চুন মিশাতে হবে যাতে অম্লমান ৬.৫-৭.৩ হয়। পীট মাটিতে শতকরা ১০-১৫ ভাগ পানি থাকে। অতিরিক্ত ১০-১৫ ভাগ আর্দ্রতা পানি যোগ করে বৃদ্ধি করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট আকারের (১০০ গ্রাম) পলিব্যাগে ভরে অটোক্লেভের মাধ্যমে পীট নির্দিষ্ট সময় ও তাপে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। বর্তমানে গামা রেডিয়েশন দিয়ে পীট জীবাণুমুক্ত করা হয়।

৫। অণুজীব সার তৈরি : উপযুক্ত কার্যাবলি সম্পাদনের পর জীবাণুমুক্ত সিরিঞ্জের মাধ্যমে প্রতি ১০০ গ্রাম পীটবিশিষ্ট পলিথিনের প্যাকেটে ৪০ মি. লি. রাইজোবিয়ামের ব্রথ প্রবেশ করিয়ে ছিদ্রকৃত স্থানটি ভালো করে বন্ধ করে দিতে হবে যাতে অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জীবাণু প্রবেশ করতে না পারে। ব্রথ প্রবেশ করানোর পর পীটের প্যাকেট ১৫ দিনের জন্য 
 সে. তাপমাত্রায় ইনকিউবেশনে রাখতে হবে এবং এরপর এ ব্যাগের পীট অণুজীব সার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

রাইজোবিয়াম অণুজীব সার জমিতে ব্যবহারের পদ্ধতি (Using Method of Rhizobium Bio-fertilizer)

জমিতে এ সারের ব্যবহার পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো:
১) অণুজীব সার বীজের সাথে মিশানোর সময় আঠালো পদার্থ হিসেবে চিটাগুড় বা ভাতের ঠান্ডা মাড় ব্যবহার করতে হয় এবং প্রতি কেজি বীজে ৪০-৫০ গ্রাম অণুজীব মেশাতে হয়।
২) ব্যবহৃত বীজে যদি ইতিপূর্বে কোনো প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করা হয়ে থাকে তবে বীজ পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে অণুজীব সার মিশাতে হবে।
৩) পরিমাণমতো উৎকৃষ্ট বীজ একটি পলিথিন ব্যাগ বা পাত্রে নিয়ে তাতে চিটাগুড় বা ভাতের মাড় মিশিয়ে এমনভাবে আলোড়ন করতে হবে যেন প্রতিটি বীজের গায়ে প্রলেপ পড়ে যায়।
৪) এ বীজের সাথে পরিমাণমতো অণুজীব সার (ছোটো বীজে ৩-৫% এবং বড়ো বীজে ২-৩%) ঢেলে নাড়তে হবে যাতে প্রতিটি বীজে একটি কালো বর্ণের প্রলেপ পড়ে।
৫) অণুজীব সার মিশ্রিত বীজ মাঠে নেবার সময় ঢেকে নিতে হবে, যেন সূর্যালোক সরাসরি না লাগে।
৬) বীজগুলোকে ছায়ায় সামান্য শুকিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সকালে (সকাল ৯টার পূর্বে) বা বিকালে (বিকাল ৪টার পর) জমিতে সারিবদ্ধভাবে বপন করে সঙ্গে সঙ্গে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
৭) ছিটিয়ে বীজ বপনের ক্ষেত্রে বিকালের দিকে বীজ বপনের পর মই দিতে হবে এবং পরদিন রোদ ওঠার আগে আবারো মই দিয়ে যতটুকু সম্ভব মাটি দিয়ে বীজগুলোকে ঢেকে দিতে হবে।



Post a Comment

Previous Post Next Post